আধমড়া বটগাছ এবং তিনটি মানবপ্রানী

-একটা সিগারেট লাগা ।
-আবার শুরু করছিস !
-শেষ করছিলাম কবে ? আজব !
বটগাছের নিচে বসে তিনটি মানব প্রানী । এই তিনজনের বিশেষণ দিতে গেলে বিশেষণগুলোর সামনে অদ্ভুত,আজব ইত্যাদি শব্দ যোগ করে দেওয়া লাগে । তারা বসেও আছে অদ্ভুত এক গাছের নিচে । বটগাছটা এক মানুষখানেক উচু হয়ে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে । সেই দুইভাগের একভাগ পুরোপুরি মরা আরেকপাশ সবুজ পাতায় ভর্তি । অদ্ভুত হলেও সত্যি জীবন্তভাগে একটা পাখির বাসাও নাই । অথচ মরা ডালের কোটরে একটা কাকের বাসা । কর্কশ মিষ্ট কন্ঠের কাকছানার শব্দ আসতেছে সেদিক থেকে। সুর্য এসে পড়েছে পশ্চিমাকাশে । মানবপ্রানী তিনটির ছায়া পড়েছে বটগাছের গুঁড়ির উপর । আর গাছের সবুজ অংশের ছায়া মরা অংশের উপর দিয়ে পুকুরের উপর পড়ে গেছে ।বোঝার কোন উপায় নাই যে গাছের এক অংশ মড়া পাতাহীন ।
তিনটি মানবপ্রানীর দুটি গায়ে গা লাগিয়ে সিগারেট ফুকছে । দুজনে এখন সিগারেটের ধোয়া দিয়ে গোলাকার ব্যান্ড বানাতে ব্যাস্ত । তৃতীয়জন একফুট খানেক দূরে বসে এই অদ্ভুত কান্ডখারখানা দেখতেই ব্যাস্ত । তার চোখে রাগ,বিরক্তিএবং আনন্দের এক অদ্ভুত মিশ্রন । মিশ্রন জিনিসটাও অদ্ভুত।
সিলেটে নাকি ১২ রঙ্গা চা পাওয়া যায় । এক গ্লাস চায়ের মধ্যে ১২ টা আলাদা আলাদা স্তর । কোনটার সাথে কোনটার মিল নাই । তৃতীয়জনের অভিব্যক্তির মধ্যে তিনটা আলাদা আলাদা স্তর রাগ,বিরক্তি,আনন্দ । কোনটার সাথে কোনটার মিল বা সংঘর্ষ নাই । অদ্ভুত ব্যাপার স্যাপার । ১২ স্তরের চা বানিয়ে সিলেটের ঐ ব্যাক্তি অনেক সুনাম কুড়িয়েছিলেন ।
আচ্ছা তৃতীয়জনের মধ্যে যে এই তিন রকমের অভিব্যক্তির ক্ষমতা দিয়েছেন সেই জন কি তাহলে সুনাম পাবার যোগ্য ?
শুনেছি মরার পর সেইজনের সাথে নাকি দেখা হবে , যদি দেখা হয় তাহলে উনার সামনেই উনার সুনাম করবো এই ধরনের অভিব্যক্তি দেওয়ার জন্য ।
আবার চলে আসি তিনজনের কাছে ।
প্রথমজন মাথায় ময়লাচুলওয়ালা সাধের বাউল । নিজেকে বাউন্ডুলে প্রমান করতে সে সদা ব্যাস্ত । তার জীবনের এক্টাই কস্ট পৃথিবীর মায়াজাল থেকে সে নিজেকে মুক্ত করে চির বাউন্ডুলে হতে পারতেছে না । দ্বিতীয়জন, যিনি মাঝখানে বসেছেন । পরিপাটি চুল পরিপাটি পোষাক । চেহারার মধ্যে ভদ্রতা ঠিকরে বের হচ্ছে । কাচা হাতে সিগারেট খাচ্ছেন । তৃতীয়জন একটা মেয়ে ।
চেহারা এবং পোষাক দেখে বলে দেওয়া যায় । সদ্য মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চ মধ্যবিত্ততে পদার্পন করেছেন । অথচ মধ্যবিত্তদের জড়তা এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি ।
তিনজনেই ভার্সিটি পড়ুয়া । প্রতিদিন বিকেলের আড্ডা বলতে এই অর্ধমৃত গাছটির নিচে বসে সিগারেট খাওয়া । অবশ্য তৃতীয়জন সিগারেট খায় না । সে বাকিদুইজনের সিগারেট খাওয়া দেখেই তৃপ্তি পায় । মাঝেমাঝে বাউন্ডুলে ছেলেটি একটা গিটার নিয়ে এসে গান গায় । তৃতীয়জন সেই গানের সাথে সাথে ঠোট্মিলায় ।গানের মাঝে বাউন্ডুলে ছেলেটির দিকে আড়চোখে তাকায় । কে জানে হয়তো বাউন্ডুলে ছেলেটি তাকে অন্যকোন কোন আকর্ষনের বেড়াজালে বন্দী করেছেন । অথচ বাউন্ডুলে ছেলেটি নির্বিকার । সে নির্বিকার কারন সে যে বাউন্ডুলে । ক্ষুদ্র প্রেম ভালোবাসার মায়ায় সে নিজেকে জড়াতে পারেনা । হয়তো সেও তৃতীয়জনের দিকে প্রেমনয়নে তাকাতে চায় । কিন্তু নিজের বাউন্ডুলেপনার বাধনের কারনে পারেনা


Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *