আমার প্রথম খুন করার গল্প

রাত দুইটা আঠার মিনিট ,
পুরো রংপুর শহর টাই এখন প্রায় নীরব । আশেপাশের ফ্লাট গুলোর লাইট আস্তে আস্তে নিভতে শুরু করেছে । রাস্তা ঘাট এখন একেবারেই খালি । মাঝে মাঝে একটা করে রিকশা যাচ্ছে । রিকশার বসার জায়গায় রাখা হয়েছে সদ্য বাজার করা হাটফেরত শাক,আলু,বেগুন জাতীয় কিছু জিনিস । এইগুলা নিয়ে বাড়ি রিকশাওয়ালা এখন বাড়ি যাবে , তার ঘুমন্ত স্ত্রী কে ডাকবে , আব্বাসের মাও ……
আব্বাসের মাও ।
আব্বাসের মা তখন ঘুমে অচেতন এদিকে রিকশাওয়ালার তখন মেজাজ চরমে । মেজাজ যতটা সম্ভব কন্ট্রোলে রেখে আবার ডাক দিবে আব্বাসে মা উঠ তারাতারি ।
আব্বাসের মা তখন উঠে বের হয়ে এত রাত করে ফেরার জন্য স্বামীর উপর চিল্লাচিল্লি করবে । কি দরকার এতো আইত করি বাড়ি আসির ?

তুই বুঝবি না পাইসার কি দরকার , আব্বাস বড় হইলে কি অকো মুই ইকশা চালাবার দিম ?

তাকি লাট সাহেব বানাইবেন ?

দরকার হয় তাই বানাইম । এখন ভালো করি রান্ধেক , শাক ৪ আটি খালি ১০ টাকাতে পাইনু ।
তাদের এই গরিবীও রোমান্স শাক রান্না হওয়া থেকে ভাত খাওয়া পর্যন্ত চলবে ।
যাইহোক রাত এখন প্রায় আড়াই টা ,
আমি রংপুরের প্রেস ক্লাবের সামনে একটা সিগারেট ধরিয়ে একা বসে আছি । মাঝে মাঝে কিছু র‍্যাব পুলিশের গাড়ি ছাড়া এখন প্রায় কিছুই নাই । অনেক ক্ষন হয় রিকশাও দেখি নাই । এই রাতে কি রহমতুল্লাহ চৌধুরী বাসায় ফিরবে ?
যদিও তিনি সবসময় গভীর রাত করেই বাসায় ফিরেন , সব খোজ খবর আগে থেকেই নেওয়া আছে ।
রহমতুল্লাহ রংপুর শহরের নামকরা ব্যাবসায়ী । সিটি বাজারের তার একটা আরত আছে সেখানে একপাশ টায় চাল আরেক টায় কাচা বাজার বিক্রি হয় । সে সেইখান থেকে হিসেব নিকাশ করে রাত আড়াই টার দিকে তার বাসায় ফেরে । তার বাসাটা প্রেস ক্লাবের পাশের রাস্তা দিয়ে গেলে মাত্র দুই মিনিটের রাস্তা । পুরো প্রেস ক্লাব এড়িয়ায় তার বাসাটা দূর থেকেও চোখে পরে । ছিমছাম ৪ তলা একটা বাসা । পুরোটাই হলুদ রঙ করা । মনে হয় এই হলুদ রঙের কারনেই দূর থেকে চোখে পড়ে ।
আমার কাজ হচ্ছে এই রহমতুল্লাহ চৌধুরী কে খুন করা । হ্যা খুন করার জন্যই এখানে আমি বসে আছি । আমি অবশ্য পেশাদার খুনি না , তবে পেশাদার অপরাধী বলতে পারেন । গত মাসে আমার বিপরীত পার্টিকে রাতের বেলার গলির মধ্যে একা পেয়ে খুর চালাইছিলাম । উদ্দেশ্য ছিলো তাকে দুনিয়া থেকে সড়ায় দেওয়া , কিন্তু সফল হয় নাই । সফল হলে আজকে আমার বুক টা এতো ধক পক করতো না ।
অবশ্য আজকের খুন টা করতাম না , রহমতুল্লাহ লোক টা ভালো মানুষ । আর ভালো মানুষ বলেই আজকে তাকে মরতে হচ্ছে । আর আমি তাকে মাড়ছি কারন সে মরলে আরেকটা ভালো মানুষ বেচে উঠবে । ভালো মানুষ টি হচ্ছে টাউন হলের একজন চা বিক্রেতা । আমি যখন কোন মারামারি করে এসে টাউন হলে বসে সিগারেট খেতাম তখন সেই চা ওয়ালা এসে চা দিয়ে যেত । টাকা থাকলেও দিত না থাকলেও দিত । হাসি মুখে বলত কি বাবা আইজকেও মারামারি করিলেন ?
তার মুখভঙ্গী দেখে মনে হয় মারামারি যেন স্বাভাবিক ব্যাপার । সে মনে হয় জিজ্ঞেস করলো কি ব্যাপার বাবা সকালে ভাত খাইছেন ? কি দিয়া খাইছেন আলু ভর্তা নাকি পাটাশাক ?
সেই চা ওয়ালা এখন হাসপাতালে । রাস্তা পার হতে গিয়ে মটরসাইকেল তার পায়ের উপর দিয়ে গেছে । সে এখন পঙ্গুপ্রায় ।
সিগারেট টা শেষ করে আরেক টা ধরালাম রহমতুল্লাহ সাহেব এখনো নাই । কতক্ষন পর যে আসবে কে জানে । সিগারেট এখন প্রায় শেষ । পকেটে আছে মাত্র ১৩ টাকা । এখন আবার সিগারেটের দাম ও বাড়ছে । কপাল ভালো হলে এই ১৩ টাকায় একটা বেন্সন এন্ড হেজেজ পাইতেও পারি । অনেকে এখন ১৪ টাকা করে নেয় ।
সিগারেট টানতেছি হটাৎ দেখি একটা মোটরসাইকেলের শব্দ । কান খাড়া হয়ে উঠলো , সিগারেট টা কেমন করে হাত থেকে পড়ে গেলো জানিনা । ডান হাত টা চলে গেলো কোমর এর কাছে । লোহার জিনিস টা এতক্ষন ঠান্ডা লাগতেছিল , হঠাৎ কেমন যেন গরম গরম লাগতেছিল । আমি একটু এগিয়ে গিয়ে শিওর হলাম রহমতুল্লাহ সাহেব কি না । হ্যা রহমতুল্লাহই তার সাথে আছে একজন । এই লোক কে ? এর কথাতো কেউ বলে নাই । ভ্যাজাল মনে হয় হয়েই যায় । গরম হয়ে থাকা রিভলভার টা হাতে নিয়ে সেফটি ক্র্যাচ টানলাম । এরপর মাত্র তিন টা শব্দ এরপর শুধুমাত্র মটোর সাইকেল এর গোঙ্গানী ছাড়া আর কিছু নেই । ১০ সেকেন্ডের মত আমি নিস্তব্দ হয়ে ছিলাম । পুলিশের গাড়ির আওয়াজ এ সৎবিৎ ফিরে পেলাম । উলটা পাশের গলি বরাবর নিঃশব্দে ছুট দিলাম । আজকে একটা খুন করতে এসে নিজের অজান্তেই জোড়া খুন করে ফেললাম । এখন দরকার একটা পরিপূর্ন ঘুম । লীডার বলেছেন কোন অপারেশন শেষে যদি কেউ পারফেক্ট ঘুম দিতে পারে তাহলে সে বেচে যাবে , না হয় সেও মরবে ।
দেখা যাক আমার ভাগ্যে কি আছে ………।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *