ভাইজান কয়টা টাকা দ্যান

–ভাইজান , সকাল থেইকা কিচু খাইনাই । কয়টা টাকা দিবেন ভাত খামু ।
— যাহ ব্যাডা এইখান থেইকা । যাহহ ।
— ভাইজান দ্যান না কয়টা টাকা ।
— যাবি নাকি মাইর লাগামু ।
অতঃপর নীরব মুখে ছেলেটি আশাহত বুক নিয়ে পিছু হটলো ।
সময়টা দুপুর । সুর্য তার সকল শক্তি দিয়ে মানুষের মাথার মগজ বয়েল করার উদ্দেশ্যে তাপ ছাড়তেছে । আর এইসময় ট্রাফিক মোড়ের কাছে একটা ছেলে এইভাবে সবার কাছে গিয়ে টাকা চাচ্ছে ।
আমি ছায়ায় দাঁড়িয়ে তখন একটা কোক কেবল মাত্র খুলেছি । কি যেন মনে করে ছেলেটা আমার কাছে আসলো না । সামনের রিকশায় বসে থাকা আরেকটা লোকের কাছে গিয়ে আবার একই কথা বললো ,
“ভাইজান সকাল থেইকা কিচু খাই নাই কয়টা টাকা দিবেন “
এবারের সংলাপ টা আগেরবারের চেয়েও বাজে হলো ।
— মাদারচোদের বাচ্চা সরবি এইখান থেকে নাকি দিমু এক লাত্থি ।
এইবার ছেলেটা ভাইজান থেকে স্যার সম্বোধন এ চলে এলো ।
— স্যার দ্যান না । সকাল থেইকা কিচু খাই নাই । রাইতেও প্যাট ভরে খাইতে পারি নাই ।
— তোর মায়েরে কইতে পারিস না ভাত দিতে ?
— মায়ে নাই ।
— কারো হাত ধইরা পালাইছে ?
মনে হয় এই কথাটা সত্যি ছিলো । ছেলেটা আর কোন কথা না বলে অসহায় দৃষ্টির ডানহাত টা আলতো করে সামনে বাড়িয়ে দিলো এই আশায় যে হয়তো লোকটা কিছু দিবে । আমি লোকটার মধ্যে কোন প্রতিক্রিয়া দেখলাম না ।
এবার লোকটার দিকে ভালো করে তাকালাম । কোট টাই পড়া নিরেট ভদ্রলোক । হাতে একটা সোনালী ঘড়ি , চোখে সানগ্লাস । ডানহাতের মুঠোও চেপে ধরা অ্যাপল কোম্পানির কোন এক মডেলের ফোন । টাকাপয়সার যে কমতি নাই সেটা তার বহিঃসজ্জা দেখলেই বুঝা যায় । অথচ মুখের ভাষা শুনে আমার মনে হলো সে কোন বস্তির মাতাল ছিনতাইকারী ।
লোকটা রিকশা থেকে নেমে চলে গেলো । ছেলেটি আবার আগের মত ভাঙ্গা মন নিয়ে সামনে এগোলো । উদ্দেশ্য হয়ত অন্য কারো কাছে অন্য কোন উপায়ে টাকা আদায়ের চেস্টা করা । আমার ইচ্ছে হলো কিছু দেই । পকেটের মধ্যে থাকা বিশাল ওয়ালেট টায় দুইটা পাচশত টাকার নোট চকচক করেছে । আজকেই বাসা থেকে নিয়েছি । কিন্তু এই টাকাটা আমার মেসের ভাড়ার জন্য দেয়া হইছে । তাই ছেলেটাকে কোন সাহায্য করার
চেস্টা করার সাহস আমার হলো না। চলে আসলাম মেসে ।
আরেকদিনের কথা ,
এক ফ্রেন্ড কে নিয়ে গেছি একটা হোটেলে । সকাল এগারোটা বাজে পেটে এককাপ চা ছাড়া কিছুই পড়ে নাই । তাই কিছু খাবো বলে হোটেলের চেয়ারে বসে আছি । ওয়েটার আসতে দেরী হচ্ছে । আমরা দুইবন্ধু দুইদিকে বসে মোবাইল চাপতেছি ।
— এক প্লেট খিচরী কত টেকা ?
শিশুকন্ঠ শুনে আমি পেছনে ঘুরে তাকালাম । দেখি হোটেলের ক্যাশিয়ার এর সামনে দাঁড়ানো ময়লা জামা গায়ে দেয়া দুইটা শিশু । একটা ছেলে আর একটা মেয়ে ।
ক্যাশিয়ার তাচ্ছিল্লো ভরে জবাব দিলো, ৪০ টাকা ।
তাইলে হাপ প্লেট খিছড়ি দ্যান ।
যা গিয়া ঐ টেবিলে বস ।
ক্যাশিয়ার আমাদের টেবিলের পরের টেবিলটার দিকে ইঙ্গিত করলো ।
ইতিমধ্যে আমার ফ্রেন্ড টা অর্ডার দিয়েছে , ” দুই প্লেট খিচুড়ি সাথে মুরগি “
শিশু দুইটা এসে আমাদের পরের টেবিলটায় বসলো ।
আমরা ততক্ষনে খাওয়া শুরু করছি । আমি খাচ্ছি আর মাঝে মাঝে তাদের দিকে তাকাচ্ছি । তাদেরও খিচুড়ি আসলো । একটা প্লেটে অল্প কিছু খিচুরী আর এক কোণে একটু ডাল । দেখলাম মেয়েটা হাত ধুয়ে সেই খিচুড়ীটুকু দুইভাগ করলো । তারপর দুইজন মিলে পরম সুখে তৃপ্তি করে সেটা খেয়ে বেড়িয়ে গেলো ।
আমার আর খিচুড়ি পেটে গেলো না । বন্ধুর খাওয়া পর্যন্ত ওয়েট করে বিল দিয়ে বের হয়ে আসলাম ।।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *