যৌগিক

অনন্তকাল অপেক্ষা করে সূর্যের আলো মিলিয়ে গিয়ে চারিদিকে গাঢ় অন্ধকারের কালো দুনিয়া জেগে উঠলো। পুকুর পাড়ের পাকুর গাছের তলায় বসে এতক্ষন সূর্য ডোবার অপেক্ষাই করছিলো গরমে অতীষ্ট মিন্টু । সূর্য যখন মাথার উপর দাঁড়িয়ে পুরা শরীর থেকে পানি শোষনে ব্যাস্ত তখন মিন্টু নিজ বাড়ি থেকে বিতারিত হয়ে পুকুরপাড়ের এই পাকুরগাছটার তলে আশ্রয় নিয়ে সূর্যতাপ থেকে বাচার ক্ষীণ চেস্টা করেছিল । এখন সেই তৃষ্ণার্ত সূর্য নিজের তৃষ্ণা মিটিয়ে অন্ধকারের হাতে পৃথিবীর শাষনভার তুলে দিয়ে গভীর ঘুমে নিমগ্ন । অথচ মিন্টু এখনো সেই পাকুরগাছে তলায় বসে যুথীর জন্য অপেক্ষা করছে । এরই মধ্যে পাকুড় গাছে বাসা বাধা পাখিগুলো নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করে সাময়িক কলহে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে । অন্ধকারের জন্য গাছের গায়ের পিঁপড়ারূপী সৈনিকদলকেও দেখা যাচ্ছে না । মনে হয় তারা সারাদিনের পরিশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পৃথিবীর কোটরে থাকা নিজ বাসভবনে চলে গেছে । অথচ মিন্টু এখনো সেখানেই বসে আছে । তার নিজেরও কেমন জানি অস্বস্তি লাগছে । ক্লান্ত শরীরের পুর্বাভাস জানাতে চোখদুটো তার আপনাআপনিই বন্ধ হয়ে আসতেছে । আসলে পাকুড় গাছের আড়ালে দাঁড়ালেও সূর্যের আক্রমণ থেকে সে রক্ষা পায় নি । সূর্য ঠিকই পাকুড়পাতার ঢাল ভেদ করে মিন্টুকে আঘাতে আঘাতে ধরাশয়ী করে ফেলেছে ।
এখন কি করবে মিন্টু ?
যুথী তো এখনো আসলো না ।
অথচ তার আসার কথা ছিলো শেষ বিকেলে সুর্যের বিদায়মূহুর্তে । আর এখন সূর্য বিদায় নিয়ে অন্ধকার এসে নিজের আস্তানায় জাঁকিয়ে বসেছে ।
তবে কি যুথী তার নিজ প্রতিশ্রুতি ভুলে গেলো !
নাকি তার বাড়িতে কোন বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে !
কথাটা মনে উঠতেই মিন্টুর বুকের ভেতরটায় হাহাকারের বেহালা বাজতে শুরু করলো। সেই বেহালার সুরের সাথে থেমে থেমে যোগ হচ্ছে বেজ ড্রামের ঢিপ ঢিপ বিট । এই ধরনের সাউন্ড তো বাংলা সিনেমায় শোনা যায় , মিন্টুর মনের মধ্যে বাজতেছে কেন ?
মনের মধ্যে বিকৃত শব্দ নিয়ে আরো কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পরেও যুথী যখন এলো না তখন বাধ্য হয়ে শান্ত পাখির মত নিঃশব্দে পাকুড়তলা থেকে প্রস্থান করলো । হাটা শুরু করেই মিন্টুর মনে হলো অন্ধকার চারিদিক থেকে কেবল তার পথকেই আষ্টেপিষ্টে আকড়ে ধরেছে । আপন মনেই আপনাকে প্রশ্ন করলো , আজ কি আমবস্যা । এই মূহুর্তে উত্তর পাওয়া অসম্ভব । খানিকক্ষন হাটার পর আবিষ্কার করলো পার্কের এই রাস্তাটার স্ট্রীটল্যাম্প গুলো আজকে জ্বলছে না । শুধুমাত্র পার্কের গেটে থাকা বড় লাইটটার আলো এখান থেকে চোখে পড়ছে । নিজের শুন্যদৃষ্টিকে সেইদিকে স্থির রেখে শব্দ করে হাটতে হাটতে সামনে এগিয়ে চললো । এই মূহুর্তে তার চোখের সামনে , মনের মধ্যে উভয় জায়গায়ই গাঢ় অন্ধকারের কুন্ডলীতে জড়ানো । চোখের সামনের অন্ধকার তো নিয়মমাফিক আর মনের অন্ধকারের কারন হচ্ছে যুথী ।
সে যে নিজগৃহ থেকে বিতারিত তা কখনোই নিজ মনে কোন প্রশ্ন কিংবা ভীতির সঞ্চার করলো না । অথচ যুথী কেন আসে নাই এই নিয়ে কোটি প্রশ্ন মাথায় গোলকৃমির মত কিলবিল করছে । কিন্তু হৃদয়ের চাহিদাকে উপেক্ষা করে মাথার চিন্তাকে প্রশ্রয় দিলে মিন্টু ভালো করেই বুঝতে পারতো যুথীর না আসাটা অস্বাভাবিক কিছু নয় ।
যুথীর চোখে চোখ রেখে কথা বলাটাই ছিলো দুঃসাহসিক কাজ । আর মিন্টু সেই দুঃসাহসিকতার গন্ডি পেড়িয়ে আরো কয়েকধাপ উপরে উঠে যুথীকে প্রেম প্রস্তাব নিবেদন করেছিলো কাল বিকেলে । সেই প্রস্তাবের উত্তরে যুথী কেবল নিজের ট্রেডমার্ক করা হাসি দিয়ে চোখটা একটু নামিয়েছিলো মাত্র । আজকে পুকুরপাড়েই তাদের ভালোবাসার প্রথম ডেটিং হতে যাচ্ছিলো । কিন্তু অদৃষ্টের কোন এক অশুভ চক্রে পরে তাদের এই শুভকাজটি সম্পাদন হয়ে উঠলো না । গুরুজনেরা বলেন সৃষ্টিকর্তা যা করেন ভালোর জন্যেই করেন । অথচ একটি সদ্য প্রস্ফুটিত ফুলওয়ালা গাছকে পানি দিয়ে বাচিয়ে না রেখে রৌদ্রতাপে বিনষ্ট করার মধ্যে কি ভালো থাকতে পারে তার সমাধান মিন্টুর ছোট মাথায় আসে না । মিন্টু মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে শতবার ধিক্কার জানিয়ে নিজগৃহ মুখে প্রত্যাবর্তন করার জন্য পা বাড়ালো । নিজ বাড়িতে তার জন্য কি অপেক্ষা করছে সেই ভাবনা মনের আকাশে উদয় হওয়া মাত্র যুথীর চিন্তা ক্ষনিকের জন্য হলেও মিলিয়ে গেলো । সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে সদ্য ধিক্কার জানানো সৃষ্টিকর্তার নাম শ্রদ্ধাভরে জপতে জপতে নিজ বাড়ির গেটে উপস্থিত হলো । সেখানে দাঁড়িয়ে ভাঙ্গা গলায় ডাক দিলো , মা ………… ।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *