রজনী

চোখ খুলে ত্রিশ সেকেন্ড লাগলো আশেপাশের পরিবেশটা বুঝতে ।
অবশ্য চোখ না খুলেও রাতুল বলে দিতে পারতো এটা হাসপাতাল বা ঐধরনের কোন জায়গা । ফিনাইলের কড়া গন্ধ এসে নাকে লাগছে । তারপরেও চোখখুলে নিজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হলো । শুয়ে আছে ছোট্ট একটা কেবিনে । মোটামুটি গোছালো একটা কেবিন । দেয়ালের রঙ এবং বেডের কাপড় দেখে বলে দেওয়া যায় এটা একটা মাঝারি গোছের প্রাইভেট ক্লিনিক । বাঁ হাতটা নাড়াতে গিয়ে অসাড়তা টের পেলো । মাথাটা সামান্য বাঁ দিকে কাত করতেই দেখতে পেলো একটা সুচ নিজের বাঁ হাতে ফোড়ানো সেই সুচের অপর প্রান্তে ঝোলানো প্লাস্টিকের বোতল ভর্তি সাদা তরল । ঢেকির মত নির্দিষ্ট সময় দম নিয়ে সেই তরল ফোটায় ফোটায় পাইপের মধ্য দিয়ে রাতুলের দেহে প্রবেশ করছে । সেদিকে নজর নিয়ে যেতেই ভেতরে তরলের যাতায়াত অনুভব করলো । ডান দিকে তাকাতেই আরেকটি বেডে রাতুল তার মা মাহমুদা খাতুন কে দেখতে পেলো । বেচারী ঘুমে ঢুলুঢুলু করছে , অথচ ঘুমাচ্ছে না । হয়তো রাতুলের জন্যই সে জেগে আছে । মায়ের মাথার উপরের দেয়ালঘড়িতে তখন রাত তিনটার মতো বাজে । এতক্ষন পর রাতুলের মাথা কাজ করা শুরু করে দিয়েছে । সে নিজেকে জিজ্ঞেস করল , ” আমি এখানে কেন ? “
মাথার প্রতিটা কোনা কোনা খুজেও সে প্রশ্নের কোন উত্তর মিললো না । শুধু মাথার পেছনে একটা গরম অনুভুতি টের পেলো । মনে হচ্ছে সেখানে কেউ একটা লোহার শিক চেপে ধরে আছে । লোহার শিকের কথা মনে আসতেই মনে পড়ে গেলো অতীতের সব স্মৃতি । খুজে পেলো তার হাসপাতালে আসার রহস্য ।

সেদিন সকাল সাড়ে সাতটা
রাতুলের ঘুম ভাংলো তার মায়ের মধুর চেচিমেচিতে । নাহহ এটা নতুন কোন ঘটনা না রাতুলের প্রতিদিন ঘুম ভাঙ্গে এই শব্দে । এই শব্দ না শুনলে মনে হয় তার ঘুম ভাংবে না । পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ হচ্ছে অন্যের ঘুম ভাঙ্গানো । এই কাজটা মাহমুদা খাতুন খুব ভালো করে এবং সহজে করতে পারেন । রাতুলের ধারনা ঘুম ভাঙ্গানোর উপর যদি নোবেল পুরস্কার দেওয়া হতো তাহলে সেটা তার মাইই পেতেন । রাতুলদের এই ছাদপেটা একতলা বাড়িটায় যে চারটা শোবার ঘর আছে তাদের ভেতরে আরাম করে ঘুমানো সকল প্রানীর ঘুম ভাঙ্গানোর কাজ খুব নিপুণ ভাবে গত একত্রিশ বছর ধরে করে আসছেন তিনি । যদিও এই সংসার নিয়ে তার অভিযোগ এর শেষ নেই । তার মোট অভিযোগ দিয়ে যদি বই লেখা যায় তাহলে সেটার সাইজ মোটামুটি দেড় হাজার পৃষ্ঠার তো হবেই । রাতুল ইদানিং মায়ের অভিযোগ গুলো খুব মনো্যোগ দিয়ে শোনে । তারপর সেগুলো সে তার ডায়েরীর বিশেষ পাতায় সংরক্ষন করে রাখে । মাহমুদা খাতুন তার দুঃখের কথাগুলো বলে হয়তো একটু শান্তি পান আর রাতুল শান্তি পায় সেগুলো নিজ ডায়েরীতে লিখে ।
যাইহোক , ঘুম থেকে উঠে রাতুল বাথরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিলো । এরপর রুমে এসের ফোনটা হাতে নিয়ে মোবাইল ডাটা কানেশনটা অন করলো । সাথে সাথে মেসেঞ্জার টুং করে বেজে উঠলো । মেসেজ এসেছে দুইটা । একটা দিয়েছে ফাহিম – কিরে ক্লাসে যাবি না ?
আরেকটা দিয়েছে সুপ্তা – আজকে দেখা করতে পারবা ? ১০ টা, থিউনি পার্কে ?
প্রথম মেসেজটা না যতটা বিরক্তি ধরিয়ে দিয়েছে দ্বিতীয় মেসেজটা তার চেয়ে কয়েকগুন বেশী আনন্দ দিয়ে দিলো । আসলেই নিউটনের তৃতীয় সুত্র সবজায়গায় খাটে । সুপ্তা রাতুলের গার্লফ্রেন্ড । বেচারা রাতুল লাস্ট তেড় দিন থেকে সুপ্তার সাথে দেখা করে নি । আজকে দেখা করতে পারবে শুনে মনে মনে গ্যাংনাম স্টাইলে নেচে নিলো । তার কাছে মনে হচ্ছে ঈদের চাঁদ ৩ মাস আগেই তার মনের আকাশে উঠে গেছে ।দুনিয়ার সবকিছু এক মুহুর্তের জন্য হলেও ভুলে যেতে বাধ্য হলো । কিছুক্ষন মনের সুখে রোমান্টিক গান গেয়ে নিলো ।
তোমাকে বেসেছি কত যে ভালো চাঁদ বুঝি তা জানে ……
গলার স্বরটা মনে হয় একটু বেশিই উচু হয়ে গেছিলো , পাশের রুম থেকে মাহমুদা খাতুন ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন, কাকে এত ভালোবাসছিস ? হা ?
ব্যাপারটার জন্য একেবারেই তৈরী ছিলো না রাতুল । “তোমাকে বেসেছি মা”, কথাটা বলে কোনরকমে তখনকার মত ব্যাপারটা ধামাচাপা দিয়ে দিলো । এদিকে মাহমুদা খাতুন ছেলের কথা শুনে একরকম অবাকই হলো । কি হয়েছে ছেলের আজ !
সে কি আর জানে ছেলে আজকে ডেটিং এ যাবে ।
অনেকদিন পর গত ঈদে মায়ের দেওয়া দামি টিশার্ট টা গায়ে চাপিয়ে নিলো । পারফিউমটা দিবে দিবে করেও দিয়ে ফেললো । বাইরে বের হয়ে দ্যাখে মা দাঁড়িয়ে হাতে নাস্তার প্লেট । সেটা শেষ করে বের হয়ে গেলো বাসা থেকে ।
আজকে সে অনেক খুশি । সে আর এমনি এমনি আশাহীন পথের পথিক হয়ে আজকে ঘুরবে না । সে আজকে যাচ্ছে ডেটিং এ । এই অনুভুতির বর্ণনা কখনো কোন কবি সাহিত্যিকের লেখায় উঠে আসে নি । এ এক অকৃত্রিম আবেগের সুখময় অনুভুতি । এখানে কোন ভাষার দরকার হয় না । এখানে কবি নীরব । নীরব কবি এই দৃশ্যের বর্ননায় এক গাদা মুচকি হাসি ছাড়া আর কিছুই দিতে পারবে না ।
খুশি মুখেই রাতুল রিকশা ডাক দিলো ।

রিকশা যাবা

কোথায় মামা ?

থিওনি পার্ক

ভাড়া কিন্তু মামা ৭০ টাকা ।

কি কও ! ভাড়া না ৪০ টাকা ?

মামা রাস্তায় জাম বেশি ভাড়া বেশি দেওয়া লাগবে নাইলে যামু না ।

ওহ আচ্ছা চলো ।
অন্যদিন হলে হয়তো মেজাজ খারাপ করে রিকশাওয়ালার উদ্দেশ্যে দুয়েকটা পবিত্রবানী ছুড়ে দিত । কিন্তু আজকে তার খুশির দিন । এদিনে সে খারাপ ব্যাবহার করতে চায় না । মনে মনে চিন্তা করতেছে এম বি এ না করে যদি রিকশা চালাইতো তাহলেই ভালো করতো । পরের উপর নিজের কথার জোর কিভাবে খাটাতে হয় সেটার সর্বোচ্চ ব্যাবহার এই রিকশাওয়ালারাই পারে ।
রিকশা এসে থামলো থিওনি পার্কের গেটে । ঘড়িতে সময় তখন নয়টা পনের মিনিট । এখনো পয়তাল্লিশ মিনিট বসে বসে অপেক্ষা করতে হবে !
তবে কিছু অপেক্ষা মধুর থেকেও মধুর হয় । কোন কোন সময় এই অপেক্ষার জন্যই অপেক্ষা করতে হয় । রাতুল বিশ টাকার বাদাম কিনে একটা বেঞ্চে এসে বস্লো । করুক রাতুল সুপ্তার জন্য অপেক্ষা ।
চলবে …

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *