হরতাল এবং হিমু

আকাশ টা অসম্ভব রকমের পরিস্কার , মেঘের ছিটেফোঁটাও নাই । দেখে মনে হচ্চছে আকাশটাকে তার প্রিয় কোন বন্ধু নীল চাদর উপহার দিয়েছেন । আর আকাশ সেটা সারাক্ষন গায়ে জড়িয়ে রাখতেছে । ঘরের জানালায় উকি দিয়ে সেই অদ্ভুত আকাশ দেখছে হিমু । অনেক টা বিরক্ত এবং অস্বস্তি বোধ করছে । সবসময় ঘরে থাকার মতো সে নয় । অন্যসময় এরকম আকাশে সে দিন রাত্রি এক করে রাস্তায় হাটতো । মাজেদা খালার বাসায় বাসি পোলাও খেতে যেত । কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস তাকে শুধু চা সিগারেট এবং মেসের রান্না করা ছাইপাঁশ খেয়ে থাকতে হচ্ছে । যদিও তার খারাপ লাগছে না । লাগার কথাও না । কারন হিমুরা পৃথিবীর সকল বিষয় বস্তুর প্রতি লোভলালসা থেকে মুক্ত । তার সব চেয়ে যেটা খারাপ লাগছে সেটা হলো পাশের রুমে ওঠা নতুন বর্ডার বারবার তার কাছে এটা ওটা নিতে আসছে । অথচ হিমুর কাছে দেওয়ার মতো কিছুই নাই । তার এরকম অনিচ্ছাকৃত স্বেচ্ছা মেস বন্দী থাকার উদ্দেশ্য তেমন কিছুই না আবার সবকিছুই ।কারন বিরোধী দল অনির্দিষ্ট কালের জন্য হরতাল ডেকেছেন । ঢাকা শহরে ঘন ঘন বন্দুকের গুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে । হিমু জানালা দিয়ে তাকিয়ে একটা জিনিস লক্ষ্য করলেন । গুলি কাউকে উদ্দেশ্য করে ছোঁড়া হচ্ছে না । ছোঁড়া হচ্ছে ফাকা গুলি মানুষকে ভয় দেখিয়ে হরতাল থেকে দূরে রাখার জন্য । অথচ প্রতি ঘন্টায় ঘন্টায় একটি করে মিছিল আসতেছে । অদ্ভুত সব নাম সেইসব মিছিলের ঝটিকা মিছিল , লাঠি মিছিল , কক্টেল মিছিল, মৌন মিছিল , সাধারন মিছিল ।হিমু জানালার ধারে বসে এইসব মিছিলে দুইটা জিনিস লক্ষ্য করলো । প্রথমেই যে মিছিল গুলো লোক বলতে ব্যানার ধরতে যে কয়জন লাগে । আর মৌন মিছিল কারীরা ইট পাটকেল ছুরতেছে কিন্তু ঝটিকা মিছিল নীরব ।
এর মানে কি ? হিমুরা কোন কিছুর রহস্য উদ্ঘাটন করতে পারে না ।মিসির আলী কে জিজ্ঞেস করে নিতে হবে । হঠাত করে হিমুর মনে হলো মিসির আলী এই মুহূর্তে কি করতেছে ? উনি কি এই সময় হরতাল নিয়ে কোন গবেষণা করছেন ? এই লোক টির সাথে হিমুর দেখা করার খুব ইচ্ছা কিন্তু কেন জানি হয়ে উঠে না । এসব ভাবতে ভাবতে রুপার কথা মনে হলো । রুপার সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করতেছে । তার এই নতুন মেসের ম্যানেজার বরকত সাহেব হিমুকে যথেস্টই সম্মান করেন উনার কাছে তার মোবাইল টা নেওয়া যেতে পারে কথা বলার জন্য । মোবাইল অবশ্য হিমুর ও ছিলো একটা। মাজেদা খালা দিয়েছিলো , কিন্তু হিমু সেটা ফেরত দিয়ে দিয়েছে । হিমু ঊঠে চলে গেলো বরকত সাহেবের ঘরে । – হিমু ভাই যে কেমন আছেন ।

বরকত সাহেব আপনার মোবাইল থেকে কথা বলা যাবে ?

এই নিন মোবাইল ।যতক্ষন ইচ্ছা কথা বলুন । দরকার হলে মোবাইল টা রেখে দিন ।
বরকত সাহেবের মতো কিপটা লোক হিমুকে একটা মোবাইল দিতে চাচ্ছে এর কি কারন হতে পারে ? হয়তো সবার মতো বরকত সাহেবের ও বিশ্বাস হিমু একজন মহাপুরুষ । কিন্তু ভালো করেই জানে সে এই বিষয়ে পাশ করতে পারে নাই । তার বাবার স্কুলে সে যে মহাপুরুষ হবার ট্রেনিং নিয়েছিলো সেইখানে সে উত্তীর্ণ হতে পারে নাই ।

হ্যালো ।

রুপা কেমন আছো ।

ভালো । তুমি ?

আমিও ভালো আছি । আচ্ছা রুপা আকাশ টাকে দেখেছ কত পরিস্কার ।

হুম দেখেছি ।

এই পরিস্কার নীল আকাশে একটা রুপালী কবুতর খুব সুন্দর দেখাতো তাই না ?
ও পাশ থেকে কোন সাড়া নেই । হিমু স্পষ্ট বুঝে গেছে রুপা এখন কাদছে । হিমুও তাকে আর ডিস্টার্ব করলো না । আসতে করে ফোন টা কেটে দিয়ে বরকত সাহেবের ঘর থেকে বের হল । গায়ে হলুদ পাঞ্জাবীটা চাপিয়ে মেস থেকে বেড়িয়ে আসলো ।
ভেতরে বসে বসে যা ভাবছিলো পরিস্থিতি তার চেয়ে একটু হাল্কাই মনে হলো ।
শুধু দোকান পাট গুলোই যা বন্ধ আর কি । হিমু এক মনে উদ্দেশ্য হীন ভাবে হাটছে ।
হঠাত একটা মৌন মিছিল তার দিকে দৌড়ে আসছে । পিছনে পুলিশ । হিমুও কোন কিছু না ভেবে মিছিলের সাথে দৌড় দিলো । কিন্তু সামনে দেখে আরেক পুলিশ বাহিনী । প্রায় পুরা মিছিলের দলটাই ধরা পড়লো । সব মিলিয়ে ১৫ জন ।
তাদের কে নিয়ে যাওয়া হলো থানায় ।
ওসি সাহেব একে একে সবার এন্ট্রি নিচ্ছেন ।
নাম কি ?
হাফিজুর রহমান
নাম কি ?
আব্দুল কালাম ।
নাম কি ?
হিমু ।
কি ?
স্যার হিমু । ভালো নাম হিমালয় ।
আমার সাথে ফাজলামি করছো ?
না স্যার আমার বাবা একটু পাগল টাইপ লোক ছিলেন তাই আমার এই উদ্ভট নাম ।
ও ।
স্যার একটা সিগারেট হবে ।
চুপ সালা ।
ওসির মেজাজ দেখেই বুঝলেন খুব চটে আছেন । এই মুহূর্তে হিমু তার খেলাটা খেললো

স্যার অভিনন্দন । আপনার বৌ পীরের মাজারে গিয়েছিলো পায়েশ দিতে ।আপনি বাবা হতে চলেছেন ।

কি ?আবার ফাজলামো হচ্ছে ? ডীম থেরাপি লাগবে ?

স্যার আমি সত্যি বলছি । বাসায় টেলিফোন করে দেখুন । আপনার বাসার করিম মিয়া ধরবে টেলিফোন ।
রাগে গজগজ করতে করতে বাসায় টেলিফোন করলেন । শুধু হ্যালো বলেই মুখখানা বিকৃত করলেন । বুঝা গেলো তার স্ত্রী বাসায় নাই ।
একটু পরে হিমুকে জেল থেকে বের করে ওসি সাহেবের রুমে নিয়ে যাওয়া হলো ।
তার সামনে দেওয়া এক কাপ চা এবং একটি বেন্সন এন্ড হেজেজ এর সিগারেট ।

এই যে মিস্টার ………

স্যার আমার নাম হিমু । ভালো নাম হিমালয় ।

ও হ্যা হিমু সাহেব । আপনি কিভাবে জানলেন আমার স্ত্রী প্রেগন্যান্ট ।

স্যার আপনাকে বলেছিলাম না আমার বাবা একজ পাগল টাইপ মানুষ ছিলেন। তিনি একটা স্কুল খুলেছিলেন । মহাপুরুষ তৈরীর স্কুল । আমি ছিলাম সেই স্কুলের একমাত্র ছাত্র ।যদি উনার ইচ্ছাটা পুরন হয় নাই । আমাকে মহাপুরুষ বানিয়ে যেতে পারেন নাই ।

ও । আপনি মিছিলে গেছিলেন কেন ।

আমি তো মিছিলে যাই নাই । মিছিল আমার কাছে গেছিলো ।
-মানে ?

আমি রাস্তা দিয়ে হাটছিলাম । হঠাত মিছিল টা আমার দিকে দৌড়ে আসলো । আমিও মিছিলের সাথে দৌড় দিলাম ।

ও। আপনি জানেন না এখনডাকায় সকল মিছিল মিটিং এর উপর নিষেধাজ্ঞা আছে ।

জানতাম । কিন্তু রাস্তায় হাটা আমার অভ্যাস তো তাই । আইন ভঙ্গ করেছি ।

আচ্ছা যান এখনি বাসায় ফিরে যান । আর আপনার ঠিকানাটা দিয়ে যান ।
হিমু ঠিকানা লিখে দিলেন ।

স্যার আর একটা সিগারেট খাওয়াবেন ।
ওসি সাহেব সিগারেট দিলেন ।

স্যার আপনাকে আরেক টা সংবাদ দেই । আপনি আজকেই এই থানা থেকে বদলি হবেন ।
কথাটা বলেই থানা থেকে সিগারেট টানতে টানতে বেড়িয়ে এলো হিমু । থিক সেই মুহূর্তে ওসি সাহেবের কাছে ফোন এলো । আর ওসি হুরমুর করে বাইরে বেড়িয়ে এসে হিমু সাহেব হিমু সাহেব বলে চিৎকার করতে লাগলেন ।
হিমু ততক্ষনে চলে গেছে তার অজানা গন্তব্যে । হয়তো মিশে যাবে আরেক টি মিছিলে । ধরা পড়বে অন্য আরেক থানার পুলিশের কাছে ।


Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *